আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘিরে যে তরুণদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা এখন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। অন্তত ১৯ জন নিহত, শতাধিক আহত এবং পুরো রাজধানীজুড়ে কঠোর কারফিউ—এটাই বর্তমানে নেপালের পরিস্থিতি। নিহতদের মধ্যে এক ১২ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু দেশজুড়ে আরও ক্ষোভ ছড়িয়েছে।
গত সপ্তাহে নেপাল সরকার একসঙ্গে ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রামসহ জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখো তরুণ-তরুণী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
সরকার যুক্তি দেখায়—ভুয়া খবর, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও অনলাইন প্রতারণা মোকাবিলার জন্য এ সিদ্ধান্ত জরুরি। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের মতে, সরকারের এ পদক্ষেপ কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিতই করেনি, বরং শিক্ষার, ব্যবসার ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মগুলোও কেড়ে নিয়েছে।
সোমবার রাজধানীর পার্লামেন্ট ভবনের সামনে সমাবেশের ডাক দেয় জেন জি তরুণরা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে হাজারো মানুষ জড়ো হন। বিক্ষোভকারীরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্লোগান দেন—
২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইউজান রাজভান্ডারী এএফপিকে বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের প্রতিবাদই প্রথম কারণ ছিল, তবে আসল লড়াই দুর্নীতি ও সরকারের আধিপত্যবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে।”
অন্যদিকে ইকশামা তুমরোক নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের প্রজন্ম পরিবর্তন দেখতে চায়। আগের প্রজন্ম অন্যায় সহ্য করেছে, কিন্তু আমরা চাই আমাদের সময়েই তার অবসান হোক।”
দুপুরের দিকে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট কমপ্লেক্সের সুরক্ষিত অংশে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী জলকামান, রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। পরে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
নেপালের যোগাযোগমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা বিবিসিকে জানান, “পরিস্থিতি এমন হয়ে গিয়েছিল যে বল প্রয়োগ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।”
সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার পর কাঠমান্ডুর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়। এর মধ্যে ছিল—
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজারাম বাসনেত বলেন, “কারফিউ ঘোষণার পর সীমিত পরিসরে সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে।”
কেবল রাজধানী নয়, অন্যান্য অঞ্চলও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় পোখরায় প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনও কারফিউ জারি করেছে। প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন।
নেপালে এটি প্রথম ঘটনা নয়।
সরকার বলছে তারা সোশ্যাল মিডিয়াকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে চায় না, বরং বিদ্যমান আইন মানতে বাধ্য করতেই এ ব্যবস্থা। তবে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও প্রাণহানির পর শোনা যাচ্ছে—সরকার হয়তো এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং নেপালের তরুণ প্রজন্মের জমে থাকা ক্ষোভ—দুর্নীতি, বৈষম্য ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—এই বিক্ষোভে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এ আন্দোলন হয়তো এক নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা