নিজস্ব প্রতিবেদক :
পার্বত্য জেলা রাঙামাটি এখন বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঐতিহাসিক তথ্যে দেখা যায়, গত ৫০০ থেকে ১,০০০ বছরে এই অঞ্চলে বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি—যা ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জেলাটির ভৌগোলিক অবস্থা, পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ভবন এবং বিল্ডিং কোড না মেনে নির্মিত হাজারো স্থাপনা রাঙামাটিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। জেলার সরকারি–বেসরকারি মিলিয়ে ২০ হাজারের বেশি ভবন রয়েছে, যার বেশিরভাগই ভূমিকম্প-সহনশীল কাঠামোয় নির্মিত নয়।
জোন–১: দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিশেষজ্ঞদের মতে, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বড় অংশ ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোন–১ এলাকায় পড়ে। ডাউকি ফল্ট লাইনের সন্নিকটে হওয়ায় এই অঞ্চল বড় ধরনের ভূকম্পনের কেন্দ্রস্থল হতে পারে।
পূর্বের ভূমিকম্পের ইতিহাস
২০০3 সালের ৬ আগস্ট বরকল উপজেলায় দু’দফা ভূমিকম্পে (মাত্রা ৫.৬) বহু সরকারি–বেসরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে বরকলে ১৮ দফা ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। ২০০৯–২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরই ছোট-বড় ভূমিকম্পে কেঁপেছে এই অঞ্চল। ২০২১ সালের ২৬ নভেম্বর মিজোরামাঞ্চলীয় ভূমিকম্পে রাঙামাটিতে ভবন ফাটল ধরে ও ৩ জন আহত হয়। ২০২4 সালের ২ জুন মিয়ানমারে ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে রাঙামাটি কেঁপে ওঠে। ২০২4 সালের ১ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ৪.৯ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয় রাঙামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, “ভূমিকম্প পূর্বাভাস দেওয়ার মতো বিজ্ঞান এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ছোট ভূমিকম্প বড় কম্পনের ইঙ্গিত হলেও নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। তবে সঠিক প্রস্তুতি থাকলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।”
রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আনোয়ার আল হক জানান, “ভবন নির্মাণের সময় বিল্ডিং কোড মানা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। রাঙামাটিকে নিয়ে বড় সচেতনতা কর্মসূচি জরুরি।” রাঙামাটি পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ সুবর্ণ চাকমা বলেন, ২০০৮ সালে সদর হাসপাতাল ও ফায়ারসার্ভিস ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল, ভবন নির্মাণে অনুমতির ক্ষেত্রে পৌরসভা সর্বোচ্চ ৭৫ ফুট (৬ তলা) পর্যন্ত অনুমতি দিতে পারে, উঁচু ভবনের জন্য জেলা প্রশাসনের অনুমতি প্রয়োজন
তবে, এসব বিষয়ে পরে আর কোনো পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাঙামাটির উপ–পরিচালক ও পৌরসভার প্রশাসক মো. মোবারক হোসেন জানান, জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা ভূমিকম্প–বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছে। চলতি বছরই কয়েকবার বাংলাদেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীকে কেন্দ্র করে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে। নভেম্বরের ২২, ২৩, ২৬ এবং ৪ ডিসেম্বরও দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু কম্পন রেকর্ড হয়। রাঙামাটি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের অন্যতম ভূমিকম্প–ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। পাহাড় কেটে নির্মিত ভবন, বেপরোয়া নির্মাণকাজ এবং বিল্ডিং কোড উপেক্ষা—সব মিলিয়ে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এই এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
সতর্কতা, পরিকল্পনা ও কাঠামোগত স্থায়িত্ব—এখনই রাঙামাটির সবচেয়ে বড় দরকার।