জেডটিভি বাংলা ডেস্ক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বরিশালে জমে উঠেছে রাজনৈতিক তৎপরতা। বিএনপির মনোনয়ন ঘোষণার পর ছয়টি আসনেই প্রার্থীরা মাঠে নেমে পড়েছেন। শোডাউন, গণসংযোগ, ব্যানার–ফেস্টুনে মুখর পুরো জেলা। পাল্লা দিয়ে মাঠ গরম করছেন জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরাও। তবে এনসিপি এখনো চূড়ান্ত তালিকা দেয়নি—যদিও ছয়টি আসনে তাদের ১১ প্রার্থী মনোনয়নপত্র কিনেছেন।
নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার সাঁটিয়ে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। তবে বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে এখনো কাউকে মনোনয়ন দেয়নি বিএনপি।
বরিশালের আসনগুলোতে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীদের মোকাবিলায় জামায়াতের কেন্দ্রীয়, মহানগর ও জেলা কমিটির শীর্ষ নেতারা প্রার্থী হয়েছেন। পাশাপাশি চরমোনাই পিরের সহোদর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ একাধিক আসনে প্রার্থী হওয়ায় ভোটের মাঠে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। চরমোনাই দরবার শরিফ বরিশাল সদর উপজেলাধীন হওয়ায় জেলা জুড়েই তাদের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক রয়েছেন।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া): এ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন মনোনয়ন পেয়ে ইতিমধ্যেই বড় শো-ডাউন করে দলকে সংগঠিত করেছেন। তিনি মনোনয়ন পাওয়ার পর ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের জনসভায় বিপুল জনসমাগম আলোচিত হয়েছে। পাশাপাশি তার নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নেতাকর্মীদের নিয়ে কমিটি গঠনসহ সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করছেন।
এ আসনের বিএনপি নেতাকর্মী ও ভোটাররা জানান, বিগত বছরগুলোতে জহির উদ্দিন স্বপন নিজ এলাকার প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়ন ও তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়াও দলের নেতৃত্বে তরুণদের চিন্তার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তিনি ব্যাপক আলোড়ন গড়ে নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন। এ আসনে জামায়াতে ইসলামী হাফেজ মাওলানা কামরুল ইসলাম খান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মো. রাসেল সরদার মেহেদীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া): এ আসনে তৃতীয় বার মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য সরফুদ্দিন আহমেদ (সান্টু)। এ আসনে সান্টু ইতিপূর্বে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনিরুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। পরে ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার মো. ইউনুসের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।
এ আসনে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন মাস্টার আবদুল মান্নান। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হয়েছেন ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা মুহাম্মাদ নেছার উদ্দীন। বাসদ নেতা অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম তারেকও এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ চালাচ্ছেন।
এছাড়া এ আসনে সাবেক এমপি গোলাম ফারুক অভির সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। অভি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আলোচিত মডেল তিন্নি হত্যা মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে ২০০২ সালে তিনি দেশ ছাড়েন। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি তিন্নি হত্যা মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পর থেকে অভির দেশে ফেরার গুঞ্জন রয়েছে এলাকায়।
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী): জেলার এ আসনটিতে বিএনপি কোনো প্রার্থী না দেওয়ায় এলাকায় নানা গুঞ্জন চলছে। এ আসন থেকে এবার মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। মনোনয়ন পাওয়ার আশায় তারা এখনো নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে আসনটিতে প্রার্থী ঘোষণা না হওয়ায় দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। যদিও এমন পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই দুই দলের প্রার্থীরা এরই মধ্যে গণসংযোগ জোরদার করেছেন। পাশাপাশি মাঠে রয়েছে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। ফুয়াদের নিজবাড়ি বাবুগঞ্জ উপজেলাধীন হওয়ায় তিনি বাবুগঞ্জ-মুলাদীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মকাণ্ডে সরব রয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামী চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই দলটির বরিশাল মহানগরের আমির জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবরকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর প্রতিদিন দুই উপজেলার নানা এলাকায় একাধিক উঠান বৈঠক ও গণসংযোগ করছেন। এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হয়েছেন উপাধ্যক্ষ মাওলানা মো. সিরাজুল ইসলাম। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বরিশাল জেলার সভাপতি।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ): এ আসনে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসানকে প্রার্থী করেছে বিএনপি। রাজীব মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে চলছে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। ২০০৮ সালে এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ। এবার তিনি মনোনয়ন না পাওয়ায় বিএনপির একাংশের মধ্যে অসন্তোষ লক্ষ করা গেছে।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন জেলা আমির মাওলানা আব্দুল জব্বার। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব চরমোনাই পিরের ছোট ভাই মুফতি সৈয়দ এছহাক আবুল খায়ের নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন অনেক আগে থেকেই।
বরিশাল-৫ (সদর-সিটি করপোরেশন): এ আসনে নানা জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে পঞ্চম বারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপি চেয়পারপারসনের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার। টানা ৩০ বছর ধরে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, মহানগর সভাপতি, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছাড়াও চার বার সংসদ সদস্য হয়ে বরিশাল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, হুইপ এবং সিটি মেয়র পদেও নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিগত কয়েক বছর রাজনীতির মাঠে তিনি কিছুটা কোণঠাসা থাকলেও মনোনয়ন পাওয়ার পর সবাই এককাট্টা হয়ে প্রচার-প্রচারণায় নেমেছেন। বিশেষ করে, বিবদমান মহানগর বিএনপির তিন গ্রুপ—ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ পদবঞ্চিতরাও সরোয়ারকে ঘিরে নির্বাচনী মাঠে সরব রয়েছেন।
এ আসনে এবার সরোয়ারের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছেন জামায়াত ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। বিএনপি ও সরোয়ারের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বিগত বছরে নির্বাচন ও দলীয়, সামাজিক কার্যক্রমে সরব থাকায় জামায়াত নেতা মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও মুফতি ফয়জুল করিমও ভোটারদের পরিচিত মুখ। তাই এ আসনের নির্বাচনের উত্তাপ যেন ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বিএনপির শো-ডাউনের পাশাপাশি জামায়াত ইসলামী শো-ডাউনে এ আসনের নির্বাচনে যেন শক্তির জানান দিচ্ছে।
এছাড়া চরমোনাই দরবার শরিফ বরিশাল সদর উপজেলাধীন হওয়ায় তাদের আলাদা ভোট রয়েছে বলে নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন। তাই এ আসনে এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এ তিন প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা। এছাড়া বাসদ নেত্রী বরিশালের সব পর্যায়ের শ্রমজীবী মানুষের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দেওয়া ডা. মনিষা চক্রবর্তী প্রার্থী হয়েছেন সদর আসনে। মনিষা চক্রবর্তীও ইতিপূর্বে সিটি, জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভোটারদের আলোচনায় রয়েছেন।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ): এ আসনে তৃতীয় বারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল হোসেন খান। এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি মুহাম্মদ ফয়জুল করীম, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মাওলানা মাহমুদুন্নবী প্রার্থী হয়েছেন।
এনসিপির মনোনয়ন চান ১১ জন
এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জেলার ছয়টি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত না করলেও শাপলা কলি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দলটির মনোনয়ন কিনেছেন ১১ জন। যাদের মধ্যে রয়েছেন—শিক্ষক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থী।
এর মধ্যে বরিশাল-১ আসনে এনসিপির একমাত্র মনোনয়নপ্রত্যাশী মাজহারুল ইসলাম নিপু। বরিশাল-২-এ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও এনসিপির ঢাকা পল্টন শাখার সদস্য অ্যাডভোকেট আলী আকবর তালুকদার ও বরিশাল মহানগর শাখার সদস্যসচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।
বরিশাল-৩ আসনে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মোক্তার হোসেন, শিক্ষক তানজিল হোসেন ও মো. সাবিদ ইসলাম শান্ত, বরিশাল-৪ আসনে একমাত্র এনসিপির বরিশাল জেলার প্রধান সমন্বয়কারী ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আবু সাঈদ মুসা মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। বরিশাল-৫ আসনে বরিশাল জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান খান, সদর উপজেলার চর কাউয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা এনসিপির জেলা কমিটির যুগ্ম সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান শিকদার ও ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম কনক মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। এছাড়া বরিশাল-৬ আসনে একমাত্র মনোনয়নপ্রত্যাশী দলের জেলা কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী সাইফুল ইসলাম প্রিন্স।
সূত্রঃ ইত্তেফাক