নিজস্ব প্রতিবেদক:
সিরাজগঞ্জে যমুনা চরের হাজার হাজার নারী-পুরুষ প্রকৃতিকে জয় করে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামে সমানতালে লড়ে যাচ্ছেন। উর্বর পলিমাটির এই চরে বেঁচে থাকার লড়াই তাদের জন্য নিত্যদিনের কাজ—আর সেই সংগ্রামে নারীর অবদান এখন দৃশ্যমান ও অনিবার্য। এ এলাকার নারীরা কোমল হাতে কাস্তে, কোদাল সমানতালে চালাচ্ছেন চরের উর্বর পলিসমৃদ্ধ মাটির বুকে। পুরুষের সঙ্গে যমুনার উর্বর পলি মাটিতে ফলাচ্ছেন নানা ফসল। বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম এখন তাদের নিত্যদিনের কাজ।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার মেছড়া চর ও কাজীপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া চরে গিয়ে দেখা গেছে, যমুনার ধু ধু মরুভূমিসম বালির মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরাও বাদাম লাগাচ্ছেন। পাশেই আরেক জমিতে গিয়ে দেখা মেলে রেহাইশুড়িবেড় চরের রেহানা মজিদ দম্পতির। জমি তৈরি করে তারা ভুট্টা লাগাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এ সময় রেহানা বলেন, ‘আমার স্বামী একা কাজ করে শেষ করতে পারেন না। বাড়তি টাকাও নেই যে, কামলা নিয়ে কাজ করাবেন। বাধ্য হয়ে আমি কয়েক বছর ধরে দুই জন মিলে জমিতে কাজ করি।’ তিন বিঘা জমিকে এরই মধ্যে এই দম্পতি ভুট্টা লাগিয়েছেন। তার মধ্যে এক বিঘা নিজের। বাকি দুই বিঘা বন্ধক নিয়েছেন।
রেহানাদের জমিতে দিনমজুরি কাজ করছেন ময়না খাতুন (৩২) নামে এক নারী। তিনি বলেন, ‘মেয়েকে কলেজে দিয়েছি এবার। অনেক খরচ। এক ছেলে স্কুলে যায়। ওদের রিকশাচালক বাবা একা কাজ করে যা পান, তাতে সংসার চলা কঠিন। তাই আমরা প্রতিবেশী রেহানাদের জমিতে কাজ করছি। কাজ বুঝে দিনে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পাই।’ এখন সংসার কেমন চলছে জানতে চাইলে আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে ময়না বলেন, ‘দুই জনের আয়ে সংসার ভালোই চলছে এখন। আগে তো ম্যালা কষ্ট করা লাগছে। শরম করে কী হবে। কাজ কইরা খাই। ভিক্ষা তো আর করি না।’
খাসরাজবাড়ী চরের হালিমার কাহিনী কিছুটা আলাদা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে তাকে। ক্লাসের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন তিনি। তার চেয়ে ১৫ বছরের বড় পাত্রের সঙ্গে বিয়ে করতে তাকে বাধ্য করে পরিবারের লোকজন। সংসারে তার চোখের জলের কোনো মূল্য ছিল না।’ মেয়ে বড় হয়েছে দ্রুত বিয়ে দিতে হবে-এটাই চরের অধিকাংশ দরিদ্র পরিবারের বাবা-মায়ের ধারণা। বিয়ের এক বছরেই হালিমার কোল জুড়ে আসে এক কন্যাসন্তান। তার বয়স বছর না পেরোতেই স্বামীর সংসারে হালিমার আর জায়গা হয় না। আরেকটি বিয়ে করে ঢাকায় পাড়ি জমান হালিমার নেশাখোর স্বামী। একদিন আসে তালাকের কাগজ। প্রভাবশালী স্বামীর পরিবারকে কিছুই বলতে সাহস পান না হালিমার বাবা-মা। সেই থেকে বিগত ১০ বছর তিনি নিজের মেয়েকে নিয়ে বাবা-মায়ের সংসারে বসবাস করছেন। নিজের খরচ চালাতে বাড়ির পাশের কিছু পরিত্যক্ত জমিতে হালিমা শুরু করেন নেপিয়ার জাতীয় ঘাসের চাষ।
পলিসমৃদ্ধ মাটিতে সে ঘাস বড় হয় দ্রুত। একদিন পাশের বাড়ির এক চাচা এসে হালিমাকে ৫০০ টাকা দিয়ে সেই ঘাস কিনে নেন। এই প্রথম নিজের পরিশ্রমের ৫০০ টাকা পালটে দেয় হালিমার জীবন। ধীরে ধীরে তিনি আরও জমি বন্ধক নিয়ে ঘাসের চাষ শুরু করেন। বাবা-মা তাকে এই কাজে বাধা দেন না। বিগত সাত বছরে ঘাস বেঁচেই হালিমা এখন স্বাবলম্বী। ঘাস চাষের পাশাপাশি নিজের বাড়িতে তিনি মুরগির খামার করেছেন। সেখানে দুই জন নারীশ্রমিক কাজ করেন। খামার থেকে এখন বেশ টাকা পাচ্ছেন তিনি। মেয়েকে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। সংসারে এখন তার অনেক কদর।
হালিমা এরই মধ্যে কাজীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের মাধ্যমে ঘাস এবং হাঁস মুরগি পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এখন তিনি নানা সময়ে অফিস থেকে পরামর্শ নেন। নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হালিমা এখন অনেকের রোল মডেল। বৃদ্ধ বাবা তাকে নিয়ে সবার কাছে গর্ব করেন।
যমুনার চরজুড়ে এমন অসংখ্য নারীর গল্প প্রতিদিনই বদলে দিচ্ছে যমুনাপাড়ের জীবনের রূপ। প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশে পুরুষের মতোই নারীর কাঁধে ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে চরের কৃষি ও অর্থনীতি।