জেডটিভি বাংলা ডেস্ক:
নাইজেরিয়ায় খ্রিষ্টানদের ওপর ‘ইসলামপন্থীদের হামলা’ বন্ধে উদ্বেগ জানিয়ে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্মীয় সহিংসতার অজুহাতে আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ এই দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ।
শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প লেখেন, নাইজেরিয়ায় খ্রিষ্টধর্ম অস্তিত্বগত হুমকির মুখে। হাজার হাজার খ্রিষ্টান নিহত হচ্ছেন। র্যাডিকাল ইসলামিস্টরা এই গণহত্যার জন্য দায়ী। তাই নাইজেরিয়াকে ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ ঘোষণা করছি।
সাধারণ প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি ঘোষণা
সাধারণত ১৯৯৮ সালের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনের আওতায় কোনো দেশকে ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও কংগ্রেসের দ্বিপক্ষীয় কমিশনের সুপারিশে। কিন্তু এবার সেই প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে সরাসরি ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
তিনি হাউস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটি ও রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান রাইলি মুর ও টম কোলকে “ফৌরন তদন্তে নামতে” নির্দেশও দিয়েছেন।
সমালোচকদের মতে, ধর্ম নয়— রাজনীতি ও সম্পদ
নাইজেরিয়ার সরকার ট্রাম্পের অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, দেশটিতে সহিংসতা শুধু ধর্মীয় নয়; সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সম্পদসংক্রান্ত দ্বন্দ্বও এর পেছনে কাজ করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ মূলত মার্কিন সংরক্ষণপন্থী খ্রিষ্টান ভোটারদের তুষ্ট করার প্রচেষ্টা। তাদের মতে, আফ্রিকার ‘সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক’ নাইজেরিয়াকে ঘিরে ওয়াশিংটনের আগ্রহ রাজনৈতিক প্রভাব এবং জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নাইজেরিয়া: তেলেই শক্তি, তেলেই টানাপোড়েন
নাইজেরিয়াকে ‘আফ্রিকার দৈত্য’ বলা হয় শুধু জনসংখ্যার কারণে নয়, বরং তার বিপুল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদের কারণে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের নাইজার নদীর বদ্বীপ অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম তেলসমৃদ্ধ এলাকা।
আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে নাইজেরিয়ার আয়ের প্রধান উৎস এই তেল শিল্প, যা আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ এই তেল খাতে পুনঃপ্রবেশের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
‘ধর্মরক্ষা নাকি প্রভাব বিস্তার?’
ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে খ্রিষ্টান সংরক্ষণপন্থী ভোটারদের কাছে বারবার ধর্মীয় স্বাধীনতার ইস্যু তুলছে। ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে এক প্রার্থনানাশক ব্রেকফাস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, প্রশাসন ‘খ্রিষ্টানবিরোধী পক্ষপাত’ দূর করতে ফেডারেল টাস্কফোর্স গঠন করবে।
জুলাইয়ে জারি করা এক মেমোতে ফেডারেল অফিসে ‘ধর্ম প্রচারের’ অনুমতি দেওয়ার পর তার প্রশাসন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
কংগ্রেসে মুর ও ক্রুজের সমর্থন
রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান রাইলি মুর ট্রাম্পের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “খ্রিষ্টানদের হত্যাযজ্ঞ বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ আনতে আমি বহুদিন ধরেই এই মনোনয়নের আহ্বান জানাচ্ছি। একইভাবে টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজও বলেন, নাইজেরিয়ার খ্রিষ্টানদের রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
শরণার্থী নীতি ও আফ্রিকান উত্তেজনা
ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে খ্রিষ্টান নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও অন্যদিকে আফ্রিকান শরণার্থীদের ভর্তির কোটা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। নতুন নীতিতে ২০২৬ অর্থবছরে মাত্র ৭,৫০০ জন শরণার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সমালোচকরা বলছেন, এই নীতি মানবিক নয় বরং নির্বাচনী রাজনীতির অংশ— যেখানে ট্রাম্প ‘ধর্মরক্ষা’র আড়ালে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণপন্থী ভোটব্যাংককে শক্তিশালী করতে চাইছেন।