নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। শিক্ষার্থীরা উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিচ্ছেন। বিশেষ করে যারা এবার প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে উচ্ছ্বাস চরমে পৌঁছেছে। দীর্ঘ ছয় বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে এক ভিন্ন রকম উন্মাদনা বিরাজ করছে।
জীবনের প্রথম ভোট: শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আশিকুল ইসলাম বলেন, “সারারাত ঘুমাইনি। ভোরে হল থেকে বের হয়ে ভোটকেন্দ্রে এসে সোয়া ৭টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছি। রুমমেট এবং হলমেটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছি। এটি আমার জীবনের প্রথম ভোট।” অন্য একজন শিক্ষার্থী তানজিলা তাসনিম আঙুলে ভোটের চিহ্ন দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন,
“যৌবনের প্রথম ভোট। এছাড়া আরও অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, যা এই নির্বাচনকে আরও উজ্জীবিত করেছে।
দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত নির্বাচন: ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে অনিয়ম ও কঠিন পরিবেশ থাকায় শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পারেননি। এবারের নির্বাচন হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে প্রথম সুষ্ঠু ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ফাহমিদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের ফ্যাকাল্টি মেম্বার, জাগো নিউজকে বলেন,
“এটাকে আমরা গণঅভ্যুত্থানের প্রাপ্তি বলতে পারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল এবং এখানেই প্রথম শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনে কিছু অনিয়ম ছিল, এবার সত্যিকারের উৎসবমুখর ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আলী আর রাজী বলেন, “দেশের মানুষ দীর্ঘদিন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ পায়নি। ডাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ তৈরি করেছে। এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য অক্সিজেনের মতো।”
ডাকসু নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনের প্রাসঙ্গিকতা
ডাকসু নির্বাচনের গুরুত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন। ফাহমিদুল হক বলেন, “জাতীয় নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ডাকসু নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে মাত্রাগত ও প্রকৃতিগত পার্থক্য রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন নির্বাচনহীন পরিবেশে প্রথম নির্বাচন হওয়ায় এটি জাতীয় নির্বাচনের একটি পূর্বরূপ হিসেবে দেখা যায়।”
আলী আর রাজী আরও বলেন, “ডাকসুর মাধ্যমে দেশ নির্বাচনের ট্রেনে উঠেছে কি না, বলা মুশকিল। অনেকেই নির্বাচনী কর্মকাণ্ডকে ট্রেনের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে ট্রেন চলে তখনই যখন ট্র্যাক ঠিক থাকে, সিগন্যাল মেনে চলা হয় এবং জ্বালানি থাকে। সঙ্গে যাত্রীরও কিছু দায়িত্ব থাকে। ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচন যাত্রা শুরু হয়েছে, তবে এটি দেশের ট্রেনের মতোই অনিশ্চিত।”
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সকাল ৮টায় শুরু হয়েছে এবং বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮টি কেন্দ্রে মোট ৮১০টি বুথে শিক্ষার্থীরা ভোট দিচ্ছেন। ভোট দেওয়ার জন্য যারা বিকেল ৪টার মধ্যে লাইনে দাঁড়াননি, তাদেরও ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী লিখেছেন, “ডাকসুর মাধ্যমে ইলেকশনের ট্রেনে উঠে গেলো বাংলাদেশ। ভোট শুরুর পর এর মাধ্যমে পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনের ট্রেনও চলবে। সবাইকে নির্বাচন মোবারক।”
শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস, উৎসবমুখর পরিবেশ এবং দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের মাধ্যমে এবারের ডাকসু নির্বাচন দেশের শিক্ষাজগতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি গড়ে তোলার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।