রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট প্রতিনিধি
পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন-এ শুরু হয়েছে চলতি বছরের গোলপাতা আহরণ মৌসুম। বন বিভাগের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) সকাল থেকে গোলপাতা কাটা শুরু হয়েছে, যা চলবে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত।তবে নৌকার মাপ নিয়ে বনবিভাগ ও বাওয়ালীদের দ্বন্দ্ব চলছে।
সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণের মৌসুম ঘিরে উপকূলের নদীতীরের জনপদগুলোয় কয়েক সপ্তাহ ধরেই ছিল ব্যস্ততা। কোথাও পুরোনো নৌকা মেরামত, কোথাও নতুন পাটাতন বসানো, আবার কোথাও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ৩ মার্চ থেকে বাওয়ালিদের সুন্দরবনে ঢুকে গোলপাতা কাটার কথা ছিল। সেই আশায় প্রস্তুতিও শেষ করেছিলেন তাঁরা। তবে নৌকার মাপ নিয়ে বন বিভাগের আপত্তি ওঠায় শেষ মুহূর্তে অনিশ্চয়তায় পড়েছে গোলপাতা আহরণ।
সুন্দরবনে বছরজুড়ে বিভিন্ন বনজ সম্পদ আহরণের মৌসুম থাকলেও গোলপাতা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে অন্যতম অর্থকরী সম্পদ। স্থানীয়ভাবে ঘরের ছাউনি, বেড়া নির্মাণ এবং বিভিন্ন গ্রামীণ কাজে গোলপাতার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করেও আয় করেন বাওয়ালীরা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর প্রায় সাড়ে চারশ’ বাওয়ালী বৈধ পাস-পারমিট নিয়ে গোলপাতা আহরণে অংশ নিচ্ছেন। নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধ ও অনুমতি সাপেক্ষে তারা নির্দিষ্ট ব্লকে প্রবেশ করে পাতা সংগ্রহ করছেন। বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রতিদিনের আহরণ, প্রবেশ ও বহির্গমনের ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
বন বিভাগ জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি নৌকা সর্বোচ্চ ১৮৬ কুইন্টাল বা প্রায় ৫০০ মণ গোলপাতা বহন করতে পারবে। সে হিসাবে সর্বোচ্চ এক হাজার মণ ধারণক্ষমতার নৌকা পর্যন্ত অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু পরিমাপ করে দেখা গেছে, গোলপাতা আহরণের প্রস্তুতি নেওয়া অধিকাংশ নৌকাই নির্ধারিত মাপের চেয়ে বড়। এ কারণে সেসব নৌকাকে আপাতত সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
বন কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে অনেক বাওয়ালি ৫০০ মণ গোলপাতার রাজস্ব দিলেও বড় নৌকায় দেড় থেকে দুই হাজার মণ পর্যন্ত পাতা বোঝাই করে এনেছেন। এমনকি গোলপাতার নিচে লুকিয়ে সুন্দরবনের মূল্যবান গাছের গুঁড়ি কেটে আনার প্রমাণও পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম ঠেকাতেই এবার নৌকার ধারণক্ষমতার সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর আহরণের সময়সীমা কিছুটা কম হওয়ায় বাওয়ালীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সময় কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ পাতা সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, বন সংরক্ষণের স্বার্থে সময়সীমা নির্ধারণ প্রয়োজনীয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অনিয়ন্ত্রিত আহরণে বনজ সম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়ম মেনে গোলপাতা কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে গোলপাতা কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আইন ভঙ্গ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বন বিভাগ সতর্ক করেছে।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং বননির্ভর মানুষের জীবিকা সুরক্ষার লক্ষ্যে চলতি মৌসুমের গোলপাতা আহরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এ উদ্যোগকে বনপ্রেমি ও পরিবেশবিদরা স্বাগত জানালেও নাখোশ আহরণকারী বাওয়ালীরা।অনেকে গোলপাতা আহরণে বনে ঢুকতে অনিহা প্রকাশ করছে।