নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ চার দশকের প্রভাবশালী উপস্থিতি রেখে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ১৫ মাস পর তিনি আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন।
হঠাৎ রাজনৈতিক উত্থান :
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনা অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার পর নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি দলের হাল ধরেন। ষাটের দশকে ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে তাঁর শুরু—ইডেন কলেজে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ঢাবিতে রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
সংগ্রাম থেকে ক্ষমতায় :
১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ–বিএনপি ঐক্যের মাধ্যমে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জয়—যেখানে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন তিনি।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। পাঁচ বছর বিরতির পর ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরেন এবং টানা চার মেয়াদ দেশ শাসন করেন। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটে তাঁর সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়; অর্থনীতি ও পোশাকশিল্পে দ্রুত উন্নয়নও তাঁর সময়েই।
সমালোচনা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগ :
দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী দমন, গণগ্রেফতার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে তাঁর সরকার তীব্র সমালোচিত হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো কার্যত একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অভিযোগ তোলে।
প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার কারাবাসকে তাঁর দল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেছিল।
পরিস্থিতি বদলে দেয় ছাত্র আন্দোলন :
সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ দ্রুতই হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে রূপ নেয়। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ–পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি ও আইএমএফ ঋণ—সমস্ত কিছু মিলিয়ে জনঅসন্তোষ তুঙ্গে ওঠে। অবশেষে গত বছরের আগস্টে অভ্যুত্থানের মুখে সেনা হেলিকপ্টারে বোনকে নিয়ে দেশ ছাড়েন তিনি। বিক্ষুব্ধ জনতা কোনো বাধা ছাড়াই গণভবনে প্রবেশ করে লুটপাট চালায়।
ট্রাইব্যুনালের রায় ও নির্বাসনের প্রতিক্রিয়া :
১৫ মাস পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে। হত্যার দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
নির্বাসন থেকে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে রায়কে “পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে আখ্যা দেন। তাঁর রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীও অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সেই আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে সর্বোচ্চ ১,৪০০ মানুষ নিহত হতে পারে এবং সরকারি নির্দেশেই দমন–পীড়ন চালানো হয়েছিল।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা :
বর্তমানে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। ইউনূস আগেই ঘোষণা দিয়েছেন—আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে না।
শেষ পর্যন্ত এক নাটকীয় পরিণতি :
১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানের সময় ইউরোপে অবস্থান করে প্রাণে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা—যে ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে সামনে এগিয়ে দিয়েছিল—শেষ পর্যন্ত সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পরিণতি হলো নির্বাসন, ক্ষমতাচ্যুতি এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়।