প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ১৪: ৩৯
আরবের তপ্ত বালুকাধূসর মরুপ্রান্তর তখন সবেমাত্র শান্ত হতে শুরু করেছে। ভণ্ড নবীদের বিদ্রোহ আর অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমন করে খলিফা আবু বকর (রা.) তখন এক বৃহত্তর লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। ইসলামের আলোকবর্তিকা শুধু আরব উপদ্বীপে সীমাবদ্ধ রাখা নয়, বরং তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তির একটি—পারস্য সাম্রাজ্যের দম্ভ চূর্ণ করে ইরাকের মাটিতে তাওহিদের ঝাণ্ডা ওড়ানোর এক মহানিষ্প্রাণ পরিকল্পনা আঁকলেন তিনি।
খলিফার এই অভিযানের মূল দর্শন ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। তিনি জানতেন, জিহাদ মানে কেবল রক্তপাত নয়; বরং মানুষের ইবাদতের পথে থাকা সব জাগতিক ও আত্মিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা। নবীজি (সা.)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করে তিনি তিনটি মূলনীতি নির্ধারণ করলেন—প্রথমে ইসলামের দাওয়াত, গ্রহণ না করলে জিজিয়া করের প্রস্তাব, আর অন্যথায় চূড়ান্ত যুদ্ধ।
খলিফার পরিকল্পনার প্রথম এবং প্রধান তুরুপের তাস ছিলেন ‘আল্লাহর তলোয়ার’ খ্যাত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)। ইয়ামামার যুদ্ধে মুসাইলামা কাজ্জাবকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার পর খালিদ তখন বিশ্রামের সুযোগও পাননি। খলিফার নির্দেশ এলো—‘সৈনিকদের নিয়ে আপনি ইরাক চলে যান, উবুল্লাহ থেকেই শুরু হোক অভিযান।’ তবে খলিফার নির্দেশ ছিল কঠোরভাবে মানবিক। তিনি খালিদকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, কাউকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না। কেবল স্বেচ্ছায় যারা আসবে, তারাই হবে ভাই। আর যারা জিজিয়া দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করবে, তাদের জান-মালের নিরাপত্তার দায়িত্ব হবে মুসলিমদের।
খলিফা আবু বকর (রা.) কেবল একদিক দিয়ে আক্রমণ করে ক্ষান্ত হতে চাননি। তিনি দাবার অন্য ঘরগুলোও সাজালেন নিপুণভাবে। ইয়াজ ইবনে গানামকে নির্দেশ দিলেন ইরাকের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে অগ্রসর হতে। খলিফার রণকৌশল ছিল—খালিদ এবং ইয়াজ দুই দিক থেকে শত্রুকে চেপে ধরবেন এবং তাদের গন্তব্য হবে ‘হীরা’।
এদিকে, পারস্যের সীমান্ত অঞ্চলে আগে থেকেই বীরত্বের সাথে লড়াই করছিলেন মুসান্না ইবনে হারিসা। খলিফা তাকেও খালিদের পতাকাতলে আসার নির্দেশ দিলেন। মুসান্না নিজের আমীরত্ব ত্যাগ করে হাসিমুখে খালিদের নেতৃত্বে লড়তে রাজি হলেন—যা ছিল মুসলিম বাহিনীর সেই সময়ের অনন্য ভ্রাতৃত্ব ও শৃঙ্খলার প্রতীক।
খলিফার পরিকল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। খালিদ ও ইয়াজের মধ্যে এক অলিখিত প্রতিযোগিতা তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি—‘তোমাদের মধ্যে যে আগে হীরায় পৌঁছাবে, সে-ই হবে মূল সেনাপতি।’ হীরা জয় করার পর তাদের লক্ষ্য ছিল পারস্যের হৃদপিণ্ড ‘মাদায়েন’। পারসিকদের দম্ভের কেন্দ্রবিন্দু এই মাদায়েন আক্রমণ করে তাদের সামরিক শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়াই ছিল খলিফার মূল লক্ষ্য।
মরুর সেই কঠিন দিনগুলোতে ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একদল অকুতোভয় সৈনিক যখন ইরাকের দিকে পা বাড়াচ্ছিলেন, তখন হয়তো পারস্য সম্রাট কিসরাও বুঝতে পারেননি—ইতিহাসের চাকা এবার চিরতরে ঘুরে যেতে চলেছে। আবু বকর (রা.)-এর সেই নিখুঁত পরিকল্পনা আর সাহাবীদের অদম্য সাহসই ছিল ইরাক জয়ের মূল চাবিকাঠি।
(বাকি অংশ পড়ুন পরের সংখ্যায়)
সম্পাদনায়: জেড টিভি নিউজ ডেস্ক