নিজস্ব প্রতিবেদক :
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দখল, লুটপাট, অর্থপাচার ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এক ভয়াবহ সংকটে পড়ে। লাগামহীন খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং সুশাসনের অভাব এই খাতকে কার্যত ভঙ্গুর করে তোলে। সেই দীর্ঘদিনের সংকট ২০২৫ সালে এসে পুরোপুরি প্রকাশ পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সাল ছিল একদিকে গভীর সংকটের বছর, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও পুনর্গঠনের সূচনাকাল। বছরজুড়ে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও খাতটি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়ে ওঠেনি।
খেলাপি ঋণ: ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাধি
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বহু বছর ধরেই খেলাপি ঋণের বোঝা বইছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি—উভয় ধরনের ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে বারবার পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও সময় বাড়ানোর সংস্কৃতি খেলাপি ঋণ কমানোর বদলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা—যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারির ফলে আগে যেসব ঋণ কাগজে ‘নিয়মিত’ দেখানো হতো, সেগুলো এখন মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এতে প্রকৃত চিত্র সামনে আসলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক চাপ ও দুর্বল আইনি কাঠামোই এই সমস্যার মূল কারণ।
ব্যাংক একীভূতকরণ: ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অনিবার্য
দুর্বল ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখতে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক একীভূতকরণ নীতিতে জোর দেয়। এর অংশ হিসেবে পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংক—এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক—একত্র করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়।
নতুন বছরেই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে এই ব্যাংক, যা হবে দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংক। এর পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকার ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে।
যদিও অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, দুর্বল ব্যাংকের দায় শক্তিশালী ব্যাংকের ওপর চাপিয়ে দিলে ঝুঁকি বাড়তে পারে, তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবি—এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না।
আমানতকারীদের অপেক্ষা ও আস্থার সংকট
সংকটাপন্ন পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা দীর্ঘদিন ধরে অর্থ ফেরতের আশায় ছিলেন। তারল্য সংকটের কারণে আমানত উত্তোলনে কঠোর সীমাবদ্ধতা থাকায় চিকিৎসা, ব্যবসা ও পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে অর্থ না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন বহু গ্রাহক।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আশ্বাস দিয়েছেন, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ডিসেম্বরের মধ্যেই আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
প্রবাসী আয়ে উল্লম্ফন, ডলার বাজারে স্বস্তি
২০২৫ সালে ব্যাংকিং খাতের জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর—প্রতিটি মাসেই রেমিট্যান্স বেড়েছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৫০৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। হুন্ডি দমন, প্রণোদনা বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং চ্যানেলের উন্নয়ন এতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরে আসে। ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ২৭ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয়
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বাজারে ডলারের উদ্বৃত্ত তৈরি হয়। বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে মোট ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার কিনেছে।
উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ব্যবসায়িক মন্দায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে। ঋণের সুদহার ১৫ শতাংশে ওঠায় নতুন ঋণের চাহিদা কমে যায়। ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি আগস্টে নেমে আসে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রেখেছে। ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার কমানো হবে না।
মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের চাপ
২০২৫ সালের শেষ দিকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৮ শতাংশ।
সংস্কারের বড় উদ্যোগ: ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ
২০২৫ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগগুলোর একটি হলো ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ অনুমোদন। এর মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ, পুনর্গঠন বা অবসায়নের আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে ‘আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করে সরকার ঘোষণা দেয়, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে সাধারণ আমানতকারীরা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা তাৎক্ষণিক ফেরত পাবেন।
এনবিএফআই ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সংস্কারের ঘাটতি
২০২৫ সালে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) সংস্কারের অংশ হিসেবে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি কম ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আস্থা পুরোপুরি ফিরতে সময় লাগবে।
উপসংহার
২০২৫ সাল বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য ছিল সংকট ও সংস্কারের যুগলবন্দি। বিধ্বস্ত এই খাতকে টেনে তুলতে নেওয়া উদ্যোগগুলো যদি ধারাবাহিকভাবে, স্বচ্ছভাবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ভবিষ্যতে একটি স্থিতিশীল ও আস্থাভাজন ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনীতির স্বার্থেই সেই পথেই এগোনো এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।