বিষয়টি একটি সহজ প্রশ্নকে সামনে আনছে। তা হলো- ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত আমিরের দল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েছে বলেই কি তিনি আপনা-আপনি বিরোধী দলের নেতা হয়ে যেতে পারেন?
আপাতদৃষ্টিতে প্রস্তাবটি অস্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে, না হয় একেবারেই উদ্ভট।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান একতরফাভাবে নিজেকে ‘বিরোধী দলীয় নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে একটি চিঠিতে তার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসানকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়নের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
গত ২২ ফেব্রুয়ারির ওই চিঠিতে জামায়াত আমির একটি ‘উদ্ভাবনী ধারণা’ তুলে ধরেছেন। প্রথম আলো ও চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াত আমির মনে করেন, ওই পদায়নের মাধ্যমে বিরোধী দলীয়দের ‘পররাষ্ট্রনীতিসমূহ’ সরকারের কাছে উপস্থাপন–পর্যালোচনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘ভারসাম্য’ রক্ষা করা যাবে।আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি উদ্ভাবনী মনে হলেও তা গুরুতর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করছে। জামায়াত আমিরের এই যুক্তি ভালো শোনাতে পারে। কিন্তু এ ধরনের নিয়োগ বা পদায়নের ফলে (যেখানে বিরোধী দলের একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে সরাসরি একটি সরকারি মন্ত্রণালয়ে বসানো হবে) সংসদে মন্ত্রিসভা এবং বিরোধী দলের বেঞ্চের মধ্যকার প্রচলিত বিভাজন থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি হবে।
যে প্রস্তাব সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে
বিরোধী দলের একজন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে সরাসরি একটি সরকারি মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ করা সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির উল্লেখজনক বিচ্যুতি: ক্ষমতাসীন মন্ত্রিসভা এবং সংসদের বিরোধী বেঞ্চের মধ্যকার পৃথক অবস্থান।
বিষয়টি ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গঠিত দশম সংসদের অস্বাভাবিক ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এবং অন্যান্য বিরোধী দল বয়কট করায় ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ বয়কটের ফলে কার্যত ক্ষমতাসীন দলের প্রাধান্য থাকলেও জাতীয় পার্টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দল ঘোষণা করা হয়। তবে সেই ব্যবস্থা অচিরেই একটি সাংবিধানিক অস্বাভাবিকতায় পরিণত হয়।
জাতীয় পার্টির তিনজন সংসদ সদস্য একসঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন পূর্ণমন্ত্রী এবং দুজন ছিলেন প্রতিমন্ত্রী।
পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। আর তার স্ত্রী রওশন এরশাদ সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন। তিনিও মন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করতেন।
ফলাফল ছিল এক অদ্ভুত রাজনৈতিক দৃশ্য: একই দলের সদস্যরা একদিকে যেমন সরকারে ছিলেন, আবার অন্যদিকে ছিলেন বিরোধী দলেও।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো জামায়াতের চিঠির প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টে বলেছেন, জামায়াত কি তাদের বিরোধী দলের ভূমিকা ছেড়ে দিচ্ছে? দলের নেতা তার উপদেষ্টাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
“বিএনপি যদি এতে সম্মত হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপদতার সূচনা হবে।”
এদিকে জামায়াত আজ মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠি নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সম্প্রতি যেটি গণমাধ্যমে এসেছে, ঘটনাটি আসলে প্রায় দুই সপ্তাহ আগের। বিষয়টি নজরে আসার পর ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে দলটি।
আরেকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন: বিরোধী দলের নেতা কে?
থামুন, এখানেই শেষ নয়।
প্রস্তাবটি আরও অদ্ভুত এই কারণে যে শফিকুর রহমান এখনো বিরোধী দলের নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাননি।
যদিও তিনি প্রকাশ্যে বিভিন্ন বক্তব্যে নিজেকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন, তবে বিরোধী দলের নেতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষমতা কেবল সংসদের স্পিকারেরই রয়েছে।

বিষয়টি একটি সহজ প্রশ্নকে সামনে আনছে। তা হলো- ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত আমিরের দল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েছে বলেই কি তিনি আপনা-আপনি বিরোধী দলের নেতা হয়ে যেতে পারেন?
উত্তর হলো- না।
একই যুক্তি সরকারের বেলায়ও প্রযোজ্য। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয় পেলেও, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আপনা-আপনি প্রধানমন্ত্রী হননি।
সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর বিএনপির সংসদীয় দল আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচন করে। এরপর সেই প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন এবং শপথবাক্য পাঠ করান। এরপরই সংসদীয় বিধি অনুযায়ী তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদীয় দলের নেতা হন।
ডা. শফিকুর রহমানের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি এখনো অসম্পন্ন রয়ে গেছে। জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দল তাকে নেতা নির্বাচিত করেছে। তবে আরও যে প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।
যদিও জামায়াতের সংসদীয় দল শফিকুর রহমানকে তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে বলে জানা গেছে, তবে এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্পিকারের কাছে জানাতে হয়। এরপর সংসদ সচিবালয় সরকারি গেজেট প্রকাশ করে তাকে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
নিয়মটি জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিরোধী দলের নেতা হলেন সেই সদস্য ‘যাকে স্পিকার মনে করেন যে তিনি সংসদে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বড় দলের নেতা।’
একই কথা ২০২১ সালের ‘বিরোধী দলের নেতা ও উপনেতা (পারিশ্রমিক ও সুবিধা) আইনেও’উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবিধানিক শূন্যতা
রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হওয়া শফিকুর রহমানের জন্য এটি দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি।
পরিহাসের বিষয় হলো এই প্রক্রিয়াগত বিলম্বের কারণ প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা।
২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। ওই বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ২৭ দিন পর ২ সেপ্টেম্বর শিরীন শারমিন চৌধুরীও পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে স্পিকারের পদটি শূন্য।
সাধারণত স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার সেই দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বিলুপ্ত দ্বাদশ সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু রাজনৈতিক অস্থিরতার কিছুদিন পরই গ্রেপ্তার হন। তিনি এখনো হেফাজতে আছেন।

এতে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠছে। তা হলো- স্পিকার না থাকলে, কার বিবেচনায় শফিকুর রহমান নিজেকে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ঘোষণা করলেন?
শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি ওই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। পরের সপ্তাহেই গ্রেপ্তার হন শামসুল হক টুকু। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রাজধানীর পল্টনে এক রিকশাচালক হত্যার ঘটনায় করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- স্পিকার না থাকলে, কার সিদ্ধান্তে জামায়াত আমির বিরোধী দলের নেতা হলেন?
শহীদ মিনার বিতর্ক
২১ ফেব্রুয়ারি বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় আসে। সেদিন শফিকুর রহমান ও তার দলের নেতারা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যান।
এটি ছিল ঐতিহাসিক। বলা হচ্ছে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর ৭৪ বছরের মধ্যে এই প্রথম জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রধান সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানালেন।
দলটি আগে কখনোই কেন সেখানে যায়নি— এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান “রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের” কথা উল্লেখ করেন।
“রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অংশ হিসেবে এটি আমার দায়িত্ব,” তিনি বলেন।
তিনি যোগ করেন, তিনি সেখানে গিয়েছিলেন “বিরোধী দলের নেতা হিসেবে”।
তবে স্পিকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়া এই দাবির আইনি ভিত্তি নেই।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অপেক্ষা
ঢাকা-১৪ আসনে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম এ বিষয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন,”১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরপরই আমরা বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদ ভবনে একটি বৈঠক করি। সেখানে বিরোধী দলের নেতা, উপনেতা এবং চিফ হুইপকে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত করা হয়। বিরোধী সদস্যরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটিই কার্যকর হবে।”
তিনি আরও বলেন,”এখন যেহেতু স্পিকার নেই, তাই কাগজপত্র হয়তো এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচিত হলে বিষয়টি বাস্তবায়িত হবে। এটি শুধু সময়ের ব্যাপার।”
ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স, ১৯৮৬ অনুযায়ী, বিরোধী দলের নেতা মর্যাদার দিক থেকে পঞ্চম স্থানে থাকেন—মন্ত্রী, চিফ হুইপ এবং সংসদের ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে একই অবস্থানে।
তবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত শফিকুর রহমানের এই দাবি রাজনৈতিকভাবে করা হলেও আইনগতভাবে এখনো নিশ্চিত নয়।
তবে এই অনিশ্চয়তা শিগগিরই শেষ হতে পারে। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ১২ মার্চ শুরু হচ্ছে। সেখানে প্রথম কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন।
এর পরেই বিরোধী দলের নেতৃত্ব এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত সুবিধা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হবে।