নিজস্ব প্রতিবেদক, লালমনিরহাট তিস্তা শুধু ভাঙছেই না, যেন গিলে খাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন আর সম্বল। শীতের আমেজে দেশ যখন উৎসবমুখর, লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বালা পাড়া গ্রামে তখন চলছে হারানোর আতঙ্ক। মাসখানেক ধরে শুরু হওয়া এই ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ফসলের মাঠ আর বালুচর। গ্রামবাসীর আশঙ্কা, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই রাক্ষুসে তিস্তা লোকালয়ে আঘাত হানবে।
নদীর পাড়ে দাঁড়ালে এখন আর শান্ত জলরাশি দেখা যায় না, কানে আসে ঝপ ঝপ করে পাড় ভেঙে পড়ার শব্দ। দক্ষিণ বালা পাড়া গ্রামের মো. আবু বক্কার সিদ্দিকী জানান, ৫৩ বছরের জীবনে তাকে দুবার বাড়ি সরাতে হয়েছে। এবার তার তিন বিঘা জমির সূর্যমুখী আর রসুন ক্ষেত নদীগর্ভে যাওয়ার অপেক্ষায়। তার ক্ষোভ, “সরকার আসলি কয় এটা করব, ওটা করব; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।” একই আর্তি ষাটোর্ধ্ব মোর্শেদা বেগমের, বিয়ের পর থেকে যার ঠিকানা পরিবর্তন করতে হয়েছে ২৫ বার।
তিস্তার এই ভয়াবহতার পেছনে উজানে ভারতীয় অংশে বাঁধ নির্মাণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় দেখা গেছে, পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে সেচ খরচ বাড়ছে ৩০০ শতাংশ, আর বর্ষায় বাড়ছে বন্যার তান্ডব। এতে বছরে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর একমাত্র আশা এখন ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। যদিও এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তাদের অজানা, তবুও তারা বিশ্বাস করেন নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ ও ভূমি উদ্ধার হলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। স্থানীয় তরুণ উজ্জ্বল মিয়া বলেন, “আমরা শুনেছি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এখানে কলকারখানা হবে, আমাদের কষ্ট দূর হবে।”
রাজনৈতিক দলগুলো বরাবরের মতো এবারও নির্বাচনী প্রচারণায় তিস্তা ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতারা এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে লালমনিরহাট জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আবু হাসনাত রানার মতে, এটি একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু। ভারত ও চীনসহ সব পক্ষকে নিয়ে একটি টেকসই ঐকমত্যে পৌঁছানো জরুরি।
তিস্তা আজ শুধু নদী নয়, উত্তরবঙ্গের দুই কোটি মানুষের টিকে থাকার লড়াই। প্রতিশ্রুতি আর রাজনীতির মারপ্যাঁচে আটকে না থেকে, খনন ও স্থায়ী বাঁধের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের এই দীর্ঘশ্বাস বন্ধ হবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগীদের।